SHARE
চি কিত্সাবিজ্ঞান বিশ্বব্যাপী অনেকদূর এগোলেও অনেক রোগই এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ বা নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে নারীদের ব্রেস্ট ক্যান্সার বা স্তন ক্যান্সার আতঙ্কজনক একটি রোগ হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে স্তন ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে জানা যায়, স্তন ক্যান্সারে বছরে নতুন করে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার প্রায় সমান। বাংলাদেশে প্রতি বছর স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন ১৪ হাজার ৮৩৬ জন নারী, যার মধ্যে বছরে মারা যান ৭ হাজার ১৪২ জন। নারী ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার ২৩.৯% ও ১৬.৯%। ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার এর তথ্যমতে, (দেশের জনসংখ্যা ১৫ কোটি ২৪ লাখ ৮ হাজার ধরে) প্রতিবছর মোট এক লাখ ২২ হাজার ৭০০ জন নতুন করে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। যার মধ্যে মারা যান ৯১ হাজার ৩০০ জন।

ব্রেস্ট বা স্তন ক্যান্সার নিয়ে অনেক গবেষণা হলেও এখন পর্যন্ত এ রোগের নির্দিষ্ট কোনো কারণ জানা যায়নি। তবে চিকিত্সাবিজ্ঞানীরা জানান, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। পশ্চিমা বিশ্বে পঞ্চাশের পরে আর বাংলাদেশে চল্লিশোর্ধ্ব নারীদের এ ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি। অবিবাহিত ও নিঃসন্তান নারী, যারা সন্তানকে কখনো স্তন পান করাননি, তাদের এ ক্যান্সার বেশি হয়। ৩০ বছরের পরে যারা প্রথমবার মা হয়েছেন তাদের স্তন ক্যান্সারের প্রবণতা একজন কমবয়সী মা হওয়া মহিলার চেয়ে অনেক বেশি। ইনকমপ্লিট প্রেগনেন্সি বা অ্যাবরশন হলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। যেসব নারীর অল্প বয়সে মাসিক শুরু হয় এবং স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি বয়সে মাসিক বন্ধ হয় তাদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকে।
অনেকে মনে করেন, যারা নিয়মিত জন্ম নিরোধক পিল খান তাদের এ ক্যান্সার হতে পারে। কিন্তু আজকাল অধিকাংশ জন্মনিরোধক পিলই নিরাপদ বলে দাবি করছেন চিকিত্সকরা। তবে কিছু ওষুধ আছে যেগুলোয় ইস্ট্রোজেনের পরিমাণ বেশি সে ধরনের পিল থেকে ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকে। এছাড়া মেনোপজের পর দীর্ঘদিন (১০ বছরেরও অধিক সময় ধরে) হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি গ্রহণ করলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। নারীদের অধিক মাত্রায় মদ্যপান ও ধূমপান স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়া জেনেটিক কারণে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। যেমন কোনো নারীর মা বা বোনের ব্রেস্ট ক্যান্সার থাকলে তার জন্য ২ থেকে ৩ গুণ বেশি ঝুঁকি থাকে। প্রলিফারেটিভ অ্যাটিপিকাল হাইপারল্পেলিয়া থাকলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রায় সাড়ে চারগুণ বেশি থাকে। কারো স্তনে অধিক মাত্রায় এক্সরে বা রশ্মি এ ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্তন ক্যান্সারের প্রবণতা বেড়ে যায়। হঠাত্ মুটিয়ে যাওয়া নারী, যারা বেশি মসলাদার, তৈলাক্ত, ভাজাপোড়া, চর্বি জাতীয় খাবার অতিরিক্ত পরিমাণে খান তাদের জন্য এ রোগের ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়।
স্তনে কোনো বিশেষ ধরনের টিউমার থেকেও এ ক্যান্সার হতে পারে। ফাইব্রোসিস্টিক ডিজিজ অথবা প্রলিফারেটিভ ব্রেস্ট ডিজিজ থেকেও ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। স্তনে এ ধরনের কিছু থাকলে টিউমারটি অপারেশন করে বায়োপসি করিয়ে নেওয়া উচিত। আবার একটি স্তনে ক্যান্সার হলে অন্য স্তন কিছুদিন পর আক্রান্ত হতে পারে। এ ধরনের ঝুঁকি থাকে শতকরা ৬ থেকে ৯ জন নারীর ক্ষেত্রে।
স্তন ক্যান্সারের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো ব্রেস্টের লাম্প বা ফোলা কোনো অংশ, কোনো নির্দিষ্ট অংশের ত্বক পুরু হয়ে যাওয়া অথবা স্তনের যে কোনো অংশে কোনো গুটলির মতো শক্ত অংশ। স্তন ফুলে গিয়ে লালচে হয়ে ওঠা বা বাহুস্থলের (বগলের নীচে) গ্ল্যান্ড বড়সড়ো (লিম্ফনোড) হয়ে যেতে পারে। তবে এর সব লক্ষণই বলবে না যে স্তন ক্যান্সার হয়েছে। এমনও দেখা গেছে একই রকম লক্ষণ থাকার পরেও স্তনের লাম্পটি ক্যান্সার নয়, সাধারণ টিউমার। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ যে, কোনোরকম লক্ষণ দেখা গেলে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে অবিলম্বে উপযুক্ত চিকিত্সকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
স্তন ক্যান্সার হলে প্রথম অবস্থায় কোনো ব্যথা-বেদনা থাকে না। এ কারণে অনেকে রোগটি সম্পর্কে বুঝে উঠতে পারেন না। ফলে যখন রোগটি সম্পর্কে জানা যায় তখন নানা সংকট তৈরি হয়। তবে একদম প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে অর্থাত্ শরীরের অন্য কোথাও ছড়িয়ে না পড়ার আগে এটি সম্পর্কে জানা গেলে রোগ পুরোপুরি সারিয়ে তোলা যায়। এ জন্য সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। নিয়মিত সেলফ ব্রেস্ট একজামিনেশন বা নিজে স্তন পরীক্ষার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে প্রাথমিক অবস্থায় স্তনের সমস্যা ধরা পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে চিকিত্সা শুরু করলে সংকট থেকে মুক্তি মিলতে পারে।
চিকিত্সকদের মতে, ২০ বছর বয়সের পর থেকেই প্রতিটি মেয়ের সেলফ ব্রেস্ট একজামিনেশন করা উচিত। পিরিয়ড শেষ হলে প্রতিমাসেই স্তন পরীক্ষা করা ভালো। আর যাদের মেনোপজ হয়ে গেছে তারা প্রতি মাসের একটি নির্দিষ্ট তারিখে নিজেই নিজের ব্রেস্ট বা স্তন পরীক্ষা করবেন। সংশ্লিষ্ট চিকিত্সকদের মতে, স্তনবৃন্ত বিনা কারণে অস্বাভাবিকভাবে ঢুকে থাকলে, স্তন বোঁটা দিয়ে রক্ত ঝরলে বা অস্বাভাবিক রস নির্গত হলে, স্তনের চামড়া কুঁচকে গেলে বা স্তনে দীর্ঘসময় ধরে দাগ পড়া স্তন ক্যান্সারের লক্ষণ। এ থেকে দূরে থাকতে হলে ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে মেয়েদের বিয়ে হওয়া বাঞ্ছনীয়। তার আগে বা পরে নয়। ঐ বয়সের মধ্যেই প্রথম সন্তান নেওয়া উচিত। শিশুকে অবশ্যই নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার করে শাকসব্জি ও ফলমূল খেতে হবে। উচ্চতা অনুযায়ী শারীরিক ওজন সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। প্রয়োজনীয় কায়িক পরিশ্রম বা হালকা ব্যায়াম করতে হবে।
n লেখক : উপ-উপাচার্য, উত্তরা ইউনিভার্সিটি

LEAVE A REPLY