SHARE

অপরাধ ছোট হলেও তাকে অপরাধ বলেই গণ্য করতে হবে। বিশেষ করে ছিনতাইয়ের মতো অপরাধকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখা যাবে না। কারণ এ ধরনের ঘটনায় সমাজের প্রায় সব শ্রেণীর মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আশা করি এখন থেকে আমাদের পুলিশ সদস্যরা ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাগুলোর ব্যাপারে তৎপর হয়ে দেশে ছিনতাই বিরোধী বিপ্লব ঘটাবেন। পুলিশের নতুন বিপ্লবের অপেক্ষায় রয়েছে দেশের ভুক্তভোগী আপামর জনগণ।ড. ইয়াসমীন আরা লেখাকিছুদিন আগে রাজধানীতে সাংবাদিক কাফি কামাল যাত্রীবেশি ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারানোর পাশাপাশি বেধড়ক মারধরের শিকার হন। শহর এলাকায় চলাচলকারী বাসের যাত্রী কাফি কামালসহ আরো কয়েকজনকে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যরা লাঠি ও ছুরি দিয়ে আঘাত করে এবং চোখে মরিচের গুঁড়া লাগিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে চলন্ত বাস থেকে তাদের ফেলে দেয়া হয়। এ ঘটনায় জড়িতদের একাংশকে ধরা হলেও শেষ পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে রহস্য উন্মোচন এবং পুরোদলকে ধরতে পারেনি পুলিশ।
গতবছর ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারান পুলিশের এএসআই মিজান ও এটিএন বাংলার সিনিয়র ক্যামেরাম্যান শফিকুল ইসলাম মিঠু। এ দুটি খুনের ঘটনার শেষ পরিণতিও আমাদের অজানা। শেষ পর্যন্ত অপরাধীরা কী শাস্তি পেল সেটা স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। তবে মিঠু ও মিজানের পরিবার তাদের অনুপস্থিতিতে কী দুঃসহ জীবনযাপন করছে তা ধারণা করা যায়। মিঠু ও মিজানের নৃশংস হত্যাকা-ের পরে ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের ব্যাপক উদ্যোগ লক্ষ্য করা গেলেও পরে তার ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি।

ছিনতাইকারীদের হাতে সাধারণ জনগণের হতাহতের ঘটনা নতুন কিছু নয়। এ ধরনের অমানবিক ঘটনা ঘটার পরে পুলিশ বা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তোড়জোড় লক্ষ্য করা গেলেও একসময় সেটা থিতিয়ে আসে। একাধিক পরিসংখ্যানে জানা যায় এ ধরনের ঘটনা যা প্রকাশ হয় তার চেয়ে বেশি অপ্রকাশিত থেকে যায়। যারা রাতে চলাচল করে তাদের এ ধরনের ঘটনার শিকার বেশি হতে হয়। কিন্তু সে অনুযায়ী পুলিশের ধারাবাহিক তৎপরতা নেই বললেই চলে। অথচ পুলিশের বহু সদস্য ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচীর প্রয়াত স্বামী সার্জেন্ট আহাদের কথা সবচেয়ে বেশি আলোচিত। তার নামে রাজধানীতে একটি পুলিশ বক্স হলেও ছিনতাইকারীদের নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণে জোরাল পদক্ষেপ খুব একটা বেশি দেখা যায়নি। মোটকথা এ ক্ষেত্রে পুলিশ কখনো জিরো টলারেন্স দেখায়নি। ফলে ছিনতাই সমস্যা প্রকারান্তরে সমাজের একটি ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানী বা দেশের অন্যান্য নগরের মানুষ রাতের বেলায় বাসে চড়তে গিয়ে বা অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যানবাহন শেয়ার করতে গিয়ে ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন। কখনো কখনো যাত্রীবেশি ছিনতাইকারীরা যাত্রীর কাছ থেকে টাকা পয়সা, ঘড়ি, মোবাইল, ল্যাপটপসহ অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে যাত্রীকে কোনো নির্জন স্থানে নামিয়ে দেয়। কখনো কখনো ওই ছিনতাইকারীরা ছিনতাইয়ের পাশাপাশি যাত্রীটির চোখে মলম লাগিয়ে দিয়ে বা অজ্ঞান করার মতো কিছু খাইয়ে মাঝপথে ফেলে দিয়ে যায়। আবার কখনো ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারাতে হয় যাত্রীকে। ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়া অনেক নগরবাসী ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই। এ ধরনের ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি জানলেও খুব সচেতন হচ্ছি তা কিন্তু নয়। আবার জনগণের জানমাল রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনী ও এ ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেখাতে পারছে না।
একটি দৈনিকের তথ্যানুযায়ী জানা যায় রাজধানীতে ৪৪১টি ছিনতাই স্পট রয়েছে। এসব স্পটে ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশের কোনো উদ্যোগ বা পদক্ষেপই কাজে আসছে না। বরং সপটগুলোয় পুলিশের নজরদারি কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি দিন দিন আরো খারাপ হচ্ছে। কিছুদিন আগে ঢাকা মহানগর পুলিশ প্রকাশিত ছিনতাই প্রতিরোধ নির্দেশিকা থেকে জানা যায় ৪৪১টি ছিনতাই স্পটের মধ্যে সূত্রাপুরে ৩৯টি, যাত্রাবাড়ীতে ৩৩১টি, উত্তরায় ২৫টি, রমনায় ২৪টি, মোহাম্মদপুরে ২৪টি, তেজগাঁওয়ে ২৩টি, ধানম-িতে ১৫টি, খিলগাঁওয়ে ১৫টি, শাহাবাগে ১৪টি, পল্টনে ১৪টি, মতিঝিলে ১৩টি, গুলশানে ১৩টি, কাফরুলে ১৩টি, মিরপুরে ১৩টি, সবুজবাগে ১২টি, আদাবরে ১২টি, লালবাগে ১১টি, হাজারীবাগে ১১টি, দক্ষিণখানে ১১টি, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে ১০টি, শাহ আলীতে ৯টি, কোতোয়ালিতে ৮টি, বাড্ডায় ৮টি, নিউ মার্কেটে ৭টি, খিলখেতে ৬টি, তুরাগে ৬টি, ডেমরায় ৬টি, শ্যামপুরে ৬টি, বিমানবন্দরে ৬টি, ক্যান্টনমেন্টে ৪টি, কামাঙ্গীরচরে ৪টি এবং উত্তর খানে ৪টি স্পট রয়েছে। এসব এলাকায় ছিনতাইয়ের সময়কাল চারভাগে বিভক্ত বলে মহানগর পুলিশের পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা রিপোর্ট সূত্রে জানা যায়।
মহানগর পুলিশের এ পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট থেকে বোঝা যায় ছিনতাইয়ের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিপূর্ণভাবে জ্ঞাত। তারপরও পরিস্থিতির উন্নতি কেন হচ্ছে না তা প্রশ্নসাপেক্ষ। পুলিশকে নিয়ে হরহামেশাই এ ধরনের প্রশ্ন উঠে থাকে যার নিরসন হওয়া খুবই প্রয়োজন এবং নিরসন করার সময় এখনই। এ বিষয়ে বর্তমানে পুলিশ কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা আছে বলে আমার বিশ্বাস। বিশেষ করে পুলিশের মহাপরিদর্শক ও ঢাকা মহানগর পুলিশের বর্তমান কমিশনার অত্যন্ত করিৎকর্মা এবং পারদর্শী বলে জানি। তাদের চেষ্টা ও নিয়মিত মনিটরিং রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার মনে হয়, রাজধানীতে এখন ছিনতাই অত্যন্ত ভয়াবহ একটি সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এ সমস্যা থেকে জনগণকে মুক্তি দিতে হবে। পুলিশের পর্যবেক্ষণ রিপোর্টটিকে আমলে নিয়ে এখন থেকে পদক্ষেপ নেয়া হলে এ সমস্যা থেকে জনগণ মুক্তি পাবে এটা আমি বিশ্বাস করি। অভিযোগ আছে ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাকে পুলিশ অনেক সময় ছোট করে দেখে। এ অভিযোগ যদি সত্য হয় তবে তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
অপরাধ ছোট হলেও তাকে অপরাধ বলেই গণ্য করতে হবে। বিশেষ করে ছিনতাইয়ের মতো অপরাধকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখা যাবে না। কারণ এ ধরনের ঘটনায় সমাজের প্রায় সব শ্রেণীর মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আশা করি এখন থেকে আমাদের পুলিশ সদস্যরা ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাগুলোর ব্যাপারে তৎপর হয়ে দেশে ছিনতাই বিরোধী বিপ্লব ঘটাবেন। পুলিশের নতুন বিপ্লবের অপেক্ষায় রয়েছে দেশের ভুক্তভোগী আপামর জনগণ।

ড. ইয়াসমীন আরা লেখা: ডিন, উত্তরা ইউনিভার্সিটি